ঢাকা, রবিবার, ৮ ফাল্গুন, ১৪৩২, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের যে ভাষাটি বেঁচে আছে শুধু দুই বোনের মুখেই খাড়িয়া ভাষা রয়েছে
বিশেষ প্রতিবেদন || Special Report
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৬ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের যে ভাষাটি বেঁচে আছে শুধু দুই বোনের মুখেই খাড়িয়া ভাষা রয়েছে
মনজু বিজয় চৌধুরী | মৌলভীবাজার |
শতবর্ষের ঐতিহ্য বহনকারী একটি প্রাচীন ভাষা এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। পুরো সম্প্রদায়ে আর কেউ নয়Íমাত্র দুই বোনের মুখে টিকে আছে ভাষাটির শেষ নিঃশ্বাস। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট চা বাগানের বর্মাছড়ায় ৮১ বছর বয়সী খ্রিস্টিনা ও ৭৬ বছরের ভেরোনিকা কেরকেটা এই দুই বোনের মুখেই টিকে আছে খাড়িয়া ভাষা। পুরো বাগান ঘুরেও তাদের ছাড়া প্রকৃত খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন কাউকে পাওয়া যায়নি।জানা যায়,মৌলভীবাজার চা বাগানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাতিসত্তা খাড়িয়াদের বসবাস। তাদের মাতৃভাষার নাম খাড়িয়া। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন ৪১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৪টি ভাষাকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। তাদের মধ্যে খাড়িয়া একটি। সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক চালু করলেও খাড়িয়া ভাষা এখনো সেই সুযোগের বাইরে।
২০১৭ সালে ‘বীর তেলেঙ্গা খারঢ়য়া ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টার’ নামে একটি যুব সংগঠনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ভাষা শেখানোর একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চেষ্টায় কোনও সফলতা পাইনি। কারণ, বাংলাদেশে খাড়িয়াদের নিজস্ব বর্ণমালা নেই।মা-বাবা ভারতের রাচি থেকে এখানকার চা বাগানে আসেন। এখানে আমাদের জন্ম হয়। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাবা-মা খাড়িয়া ভাষা বলত। তাদের কাছ থেকে শেখা। বর্তমানে বাগানে অনেক ভাষার মিশ্রণে আমাদের সন্তানরা মাতৃভাষা বলতেও পারে না, এমনকি বুঝেও না। এই বাগানের মধ্যে আমরা দুই বোন খাড়িয়াতে কথা বলতে পারি। সুখ-দুঃখে আমরা আমাদের দুই বোনের মধ্যেই আমাদের ভাষায় কথা বলি। এতে আমাদের প্রাণ খুলে মনের ভাব প্রকাশ করি।খ্রিস্টিনা কেরকেটা ও ভেরোনিকা কেরকেটা জানান, আমাদের নতুন প্রজন্মের কেউ এই ভাষায় কথা বলতে পারে না। এজন্য তারা বাংলা ভাষায় কথা বলে। আমাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি এই ভাষায় কথা বললে হাসাহাসি করে, ঠাট্টা করে।‘এই গ্রামে আমি আর আমার ছোট বোন ছাড়া কেউ এই ভাষায় কথা বলতে পারে না। ছোটবেলায় আমরা সবাই এই ভাষায় কথা বলতাম। এখন কেউ বুঝে না।স্থানীয়বাসিন্দা এবং পরিবারের সদস্যরা জানান, সম্পর্কে আপন বোন হোন তারা দুজনেই আমাদের ফারসি ভাষা জানে।কিন্তু তারা যখন দুইজন থাকেন ঠিকই তারা ফারসি ভাষায় কথা বলেন,কিন্তু আমরা বুঝি না,কারণ ছোট থেকেই আমরা সেটা শিখতে পারিনি। আগামীতে যে আমাদের মাতৃভাষা দিবস আসছে,এই দিবসে যেন আমরা এ ভাষা নিয়ে একটু চর্চা করতে পারি। খাড়িয়া ভাষা সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ কিংবা বই-পুস্তক নেই। তাই এটি সংরক্ষণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের দাবি জানান।মৌলভীবাজার ভাষা ও সংস্কৃতি গবেষক এডভোকেট মোস্তাক আহমদ মম বলেন,জাতীয় ভাষা কমিশন গঠন করে নৃগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষা অন্তর্ভুক্ত ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ অপরিহার্য। দুই নারী ছাড়া দেশে আর কেউ ভাষাটি জানে না, বোঝে না বা চর্চা করে না; তাদের মৃত্যুর সঙ্গে এ দেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাবে ভাষা খাড়িয়া।
জেলার খবর