ঢাকা, শনিবার, ২২ ফাল্গুন, ১৪৩২, ৭ মার্চ ২০২৬
এমপির পিএস হয়ে শত কোটির মালিক শরীফ
বিশেষ প্রতিবেদন || Special Report
০৪ মার্চ ২০২৬, ০২:০৩ অপরাহ্ন
এমপির পিএস হয়ে শত কোটির মালিক শরীফ
সাভার প্রতিনিধি |
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার-গণঅভ্যুত্থানের পর আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে ফুলেফেঁপে ওঠেন বিএনপি'র বহু সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। শুধু তাই নয়, তাদের পিএস এবং এপিএসরাও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠেন। দামি গাড়ি কিনেছেন, বিশাল বাড়ি গড়েছেন,আর ক্ষমতার সংস্পর্শে জীবনযাত্রা বদলে গিয়েছে একেবারেই নতুন রূপে।সর্বশেষ বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত দেড় বছরে সাভার-আশুলিয়ার এমপি ডাঃ দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার দাপট, টেন্ডার, কমিশন ও তদবির-বাণিজ্য এবং চাকরিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির মাধ্যমে বিত্তশালী হয়েছেন কথিত পিএস মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম শরীফ।২০২৪ সালের আগে তার এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল সীমিত; কিন্তু ক্ষমতার সংস্পর্শে এসে সেই চিত্র দ্রুত পাল্টে গেছে।ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর কথিত পিএস শরীফুল ইসলাম শরীফ পেশাগতভাবে শুরু করেছিলেন পোশাক কারখানায় চাকরি করে। অথচ এখন তিনি আনুমানিক প্রায় ১১৪ কোটি টাকার মালিক।
২৬ জুন ১৯৭৩ সালে পাথালিয়া ইউনিয়নের ধনিয়া গ্রামের আছার উদ্দিন আহমেদের ছেলে শরীফ, ৫ আগস্টের পর পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে মিলে প্রথমে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার ইপিজেড এলাকার তিনটি গার্মেন্টস নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুরো ইপিজেড এলাকা তার নিয়ন্ত্রণে আসে।বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দৈনিক প্রায় ১ কোটি টাকার বাণিজ্য পরিচালনা করছেন তিনি।শরীফ নিয়ম বহির্ভূতভাবে এমপির নাম ভাঙিয়ে পাথালিয়া ইউনিয়নের গণ বিদ্যাপীঠ স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতির পদ দখল করেন। স্কুলের শিক্ষক ও কর্মীদের উপর ভয়-ভীতি চালিয়ে অর্থ আদায় এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।পাথালিয়া ইউনিয়নের নয়ারহাট এলাকার ধলেশ্বরী ও বংশী নদীর সংযোগস্থলে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। বিরুলিয়া ইউনিয়নের তুরাগ নদী থেকেও বালি উত্তোলন করে অর্থ উপার্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি সাংবাদিকদের রিপোর্টে বিষয়টি উঠে আসলে, তিনি অর্থ দিয়ে তা ম্যানেজ করেছেন।নয়ারহাট বাজারের সরকারি জমি নিজ নামে লিজ নিয়ে অর্ধ শতাধিক দোকান বসিয়ে এককালীন দোকান প্রতি তিন লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে দোকান প্রতি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আদায় করেন। আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা থাকলেও সাভার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আমজাদ হোসেনকে বিনিময়মূলকভাবে বহাল রেখেই পৌরসভার টেন্ডার ও হাট বাজারের নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ আদায় করেন।শরীফ প্রায় নিয়মিতভাবে বিদেশ ভ্রমণ করেন-থাইল্যান্ড, নেপাল, মালয়েশিয়া, দুবাই-এবং বিলাসিতার জন্য ক্যাসিনো খেলেন। নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের এক সিনিয়র সহকারী সচিবের নাম ভাঙিয়ে এমপির কাছ থেকেই অর্থ হাতিয়ে নেন। এছাড়াও সাংবাদিকদের সম্মানী হিসাবেও অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।আশুলিয়া থানায় বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সরকারি চাকরিজীবীর নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলে অন্তত ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে সার্বিক বিষয়ের উপর একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রিপোর্ট করেছে।শরীফ আওয়ামী লীগ নেতাদের দলে ভিড়িয়ে তাদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করেছেন। ডিস ব্যবসা, ইন্টারনেট ব্যবসা, এমনকি মাদক ব্যবসাও তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।এক কথায়, গার্মেন্টস কর্মী থেকে শতকোটির মালিক-এমপির পিএস মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম শরীফের কাহিনী সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতার এক স্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তোলে, যা বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি এবং স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জেলার খবর