ঢাকা, সোমবার, ১ চৈত্র, ১৪৩২, ১৬ মার্চ ২০২৬
পীরগাছার ৯ ইউনিয়নে ভিজিএফ বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ: ইউএনও’র বিরুদ্ধে দলীয় কোটা নির্ধারণ, প্রশাসকের নামে ৩৭৭ স্লিপ
বিশেষ প্রতিবেদন || Special Report
১৫ মার্চ ২০২৬, ০৯:২২ অপরাহ্ন
পীরগাছার ৯ ইউনিয়নে ভিজিএফ বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ: ইউএনও’র বিরুদ্ধে দলীয় কোটা নির্ধারণ, প্রশাসকের নামে ৩৭৭ স্লিপ
এম এ হোসেন পাটোয়ারী | প্রতিনিধি,পীরগাছা (রংপুর) |
রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির চাল বণ্টনে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও সুপারিশের ভিত্তিতে কার্ড বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ বসাকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।উপজেলা প্রশাসনের দাপ্তরিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে পীরগাছা উপজেলায় ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় মোট ৪৮ হাজার ৩৮৪টি কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব কার্ডের মাধ্যমে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল বিতরণের কথা রয়েছে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যেসব পরিবারে ভিটাবাড়ি ছাড়া জমি নেই, দিনমজুরির আয়ের ওপর নির্ভরশীল, উপার্জনক্ষম সদস্য নেই, স্বামী পরিত্যক্তা নারী প্রধান পরিবার, প্রতিবন্ধী বা অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার—এমন অন্তত চারটি শর্ত পূরণ করা পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভিজিএফ কার্ড দেওয়ার কথা। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে কার্ড দেওয়া বিধিমালায় নিষিদ্ধ।কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এসব নীতিমালা উপেক্ষা করে তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় অনেক পরিবার তালিকা থেকে বাদ পড়লেও তুলনামূলক সচ্ছল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজন তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কোনো সরকারি নির্দেশনা বা আইনি বিধান না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নামে ১২ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত কোটা নির্ধারণ করে ভিজিএফ কার্ড বণ্টনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেই ‘দলীয় সমন্বয়’ দেখিয়ে এ ধরনের কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।স্থানীয়দের দাবি, এই নির্দেশনার কারণে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের তালিকা তৈরির পরিবর্তে রাজনৈতিক সুপারিশ ও প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে, যা বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।এদিকে উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নে ভিজিএফ বণ্টন নিয়ে আরও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়নের প্রশাসক বিজয় কুমার নিজের নামেই ৩৭৭টি ভিজিএফ স্লিপ নিয়েছেন। অথচ আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারী ভূমিহীন ও হতদরিদ্র বহু পরিবার কোনো স্লিপ পাননি। এতে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ যদি রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অনিয়মের কারণে বণ্টিত হয়, তাহলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হবে এবং কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, ৪৮ হাজারের বেশি ভিজিএফ কার্ড যদি রাজনৈতিক কোটায় বণ্টিত হয় এবং প্রশাসনের তদারকিতে অনিয়ম ঘটে, তাহলে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সরকারের এই সহায়তা কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জেলার খবর