মতামত

তারেক রহমানের কি চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির নতুন সূচনা?
আবুনাসের লিমন

আবুনাসের লিমন

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৬ অপরাহ্ন

News image
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারগুলোর জন্য ভারত সফর ছিল এক ধরনের অলিখিত কূটনৈতিক রীতি। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারা ভেঙে তারেক রহমান প্রথম সফরের জন্য বেছে নিয়েছেন চীনকে। মালয়েশিয়া হয়ে বেইজিংয়ে পৌঁছানো এই সফর নিছক একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি নতুন দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত।

কূটনীতিতে প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটি প্রতীকী ভাষা থাকে। রাষ্ট্রনায়কদের সফরসূচি, বৈঠকের স্থান, এমনকি সফরের ক্রমও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বার্তা বহন করে। সেই বিবেচনায় তারেক রহমানের চীন সফর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ কি ভারতের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে এসে নতুন কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করছে? নাকি এটি কেবল জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব প্রকাশ?

ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ এবং কূটনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে নয়াদিল্লি এই ঘটনাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, বাংলাদেশ শুধু ভারতের প্রতিবেশী নয়; ভারতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি এবং বঙ্গোপসাগরভিত্তিক কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গত দেড় দশকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগে দুই দেশ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু সেই সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে একটি প্রশ্নও ক্রমশ জোরালো হয়েছে সম্পর্কটি কি রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের, নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ভারতের কৌশলগত বোঝাপড়ার ফল?

নতুন সরকার সম্ভবত সেই ধারণা পরিবর্তন করতে চাইছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন এমন একটি বার্তা দিতে চায় যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একক রাষ্ট্রনির্ভর হবে না; বরং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। 

এই প্রেক্ষাপটে চীন বাংলাদেশের জন্য একটি স্বাভাবিক বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত এক দশকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগীতে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিস্তা অববাহিকা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে চুক্তিটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ঢাকা বিকল্প উন্নয়ন অংশীদারের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়েছে। তিস্তা মেগা প্রকল্পে চীনের আগ্রহ তাই কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি একটি কৌশলগত বাস্তবতা।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও চীনের গুরুত্ব বাড়ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রপ্তানি বাজারের প্রতিযোগিতা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাংলাদেশের জন্য বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন তৈরি করেছে। পশ্চিমা অর্থায়ন যেখানে নানা শর্তসাপেক্ষ, সেখানে চীন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বৃহৎ বিনিয়োগের সুযোগ দিচ্ছে। ফলে ঢাকার কাছে বেইজিং একটি কার্যকর অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হওয়াই স্বাভাবিক।

তবে এই সম্পর্কের মধ্যেও ঝুঁকি রয়েছে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর প্রকল্পের অভিজ্ঞতা এখনো আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত। অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা এবং কৌশলগত অবকাঠামোতে বিদেশি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশকে তাই চীনা বিনিয়োগ গ্রহণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্বও দ্রুত বাড়ছে। বঙ্গোপসাগর আজ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সমন্বয়ে গঠিত কৌশলগত উদ্যোগ; অন্যদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুই প্রবল ভূরাজনৈতিক প্রবাহের মাঝখানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। কারণ, বড় শক্তিগুলো প্রত্যেকেই বাংলাদেশকে তাদের কৌশলগত পরিসরের অংশ হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনো শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ না হয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতা নির্দেশ করে। মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা কিংবা ভুটান প্রত্যেকেই ভারতের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এটি ভারতবিরোধী অবস্থান নয়; বরং একটি বহুমাত্রিক কূটনৈতিক কৌশল। বর্তমান বিশ্বে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এটাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক এমন গভীর যে কোনো সরকারই সেই সম্পর্ককে উপেক্ষা করতে পারবে না। বাংলাদেশের রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভারতের গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া মানেই ভারতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

বরং নতুন বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে চায় যেখানে দিল্লি ও বেইজিং উভয়ের সঙ্গেই কার্যকর সম্পর্ক বজায় থাকবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, টোকিও এবং মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করা হবে।

এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারসাম্য রক্ষা। ইতিহাস বলে, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঝে অবস্থানকারী দেশগুলোকে প্রায়ই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখনো অর্থনৈতিক সুবিধা, কখনো নিরাপত্তা, কখনো রাজনৈতিক চাপ বিভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশের জন্যও সেই পরীক্ষা সামনে অপেক্ষা করছে।

তারেক রহমানের চীন সফর তাই একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে এই অধ্যায়ের সফলতা নির্ভর করবে সফরের প্রতীকী গুরুত্বের চেয়ে বেশি বাস্তব অর্জনের ওপর। চীন থেকে কত বিনিয়োগ আসবে, কোন প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, বাংলাদেশের রপ্তানি কতটা বাড়বে এবং জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এই সফরের প্রকৃত মূল্য।

ভারত নাখোশ কি না, সেটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি নিজের স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারছে? একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য বিষয়।

ঢাকা যদি প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, একই সঙ্গে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, তবে এই সফর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। ড্রাগনের দিকে মুখ ফেরানো মানে ময়ূরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং এটি সেই বার্তা যে, বাংলাদেশের নিজস্ব কণ্ঠস্বর রয়েছে এবং নতুন যুগে সেই কণ্ঠস্বর নিজের স্বার্থ, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের পক্ষে আরও দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হবে।

S23 ULTRA

বিজ্ঞাপন

ADVERTISEMENT

331 × 238 px

স্লাইড 1 / 3

ক্যালেন্ডার
তারিখ নির্বাচন করুন

জুলাই ২০২৬

সোম

মঙ্গল

বুধ

বৃহ

শুক্র

শনি

রবি