জাতীয়
ঘাম ঝরানো ফসল গেল বানের জলে- নতুন আশায় মাঠে কৃষকমনজু বিজয়, চৌধুরী
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | সিলেট
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৬ অপরাহ্ন
কয়েকদিন আগেও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ছিল সবুজ ফসলের সমারোহ। আউশ ধান, বীজতলা ও মৌসুমি সবজির ক্ষেত দেখে কৃষকের মুখে ছিল স্বস্তির হাসি। অনেকেই ব্যাংক ঋণ ও ধারদেনা করে চাষাবাদ করেছিলেন, আশা ছিল ফসল ঘরে তুলে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু আকস্মিক বন্যা সেই স্বপ্নকে মুহূর্তেই তছনছ করে দিয়েছে।
বন্যার পানি নেমে গেলেও রেখে গেছে কাদামাটিতে চাপা পড়ে থাকা কৃষকের ঘাম, শ্রম ও বিনিয়োগের নির্মম চিহ্ন। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধুই ক্ষত-বিক্ষত জমি আর হতাশ কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। তবুও বুকভরা কষ্ট চাপা দিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামে মাঠে নেমেছেন তারা।
সাম্প্রতিক বন্যায় উপজেলার আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও মৌসুমি সবজি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জমিতে বন্যার সঙ্গে ভেসে আসা পলি ও বালু জমে থাকায় নতুন করে আবাদ শুরু করতে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কেউ বীজতলা প্রস্তুত করছেন, কেউ জমি পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ আমন রোপণের জন্য জমি তৈরি করছেন। তাদের একটাই লক্ষ্য আমন ধানের মাধ্যমে অন্তত আউশের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বন্যায় প্রায় ৭০ হেক্টর আউশ ধানের জমি, ৩০ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২৬ হেক্টর সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মখাবিল এলাকার টমেটো চাষি আব্দুর রহিম বলেন, "ঋণ করে দুই কিয়ার জমিতে টমেটো চাষ করেছিলাম। বানের পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, সেই চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।"
একই এলাকার কৃষক তোফায়েল আহমেদ ও মজিদ খান জানান, তিনজন মিলে ১০ কিয়ার জমিতে টমেটো চাষের জন্য জমি প্রস্তুত, সার প্রয়োগ এবং চারা রোপণ করেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানিতে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
পতনঊষার এলাকার কৃষক তোয়াবুর রহমান বলেন, "আমাদের এলাকা সরাসরি নদীভাঙনের শিকার না হলেও নিচু হওয়ায় বন্যার পানিতে ধানের জমি ডুবে ছিল। এখন ফসল হবে কি না, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছি।"
অপর কৃষক মাসুদ মিয়া বলেন, "বন্যার পানিতে আমার আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কীভাবে রোপা আমনের আবাদ করব বুঝতে পারছি না।"
কৃষক মোশরফ বলেন, "ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টমেটো চাষ করেছিলাম। বন্যার পানিতে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন সংসার চলবে কীভাবে, আর ঋণই বা কীভাবে শোধ করব কিছুই বুঝতে পারছি না।"
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, "বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সঠিক তথ্য যাচাই শেষে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, "বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে বীজ ও সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ বিতরণের ব্যবস্থা করা হবে।"
বন্যার আঘাতে কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হলেও তারা থেমে নেই। নতুন আশায়, নতুন উদ্যমে আবারও মাঠে ফিরেছেন। এখন তাদের প্রত্যাশা সরকারি সহায়তা দ্রুত পৌঁছালে আমন মৌসুমে ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে পারবেন কমলগঞ্জের কৃষকরা।
বিজ্ঞাপন
ADVERTISEMENT
331 × 238 px
স্লাইড 1 / 3
জুলাই ২০২৬
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র
শনি
রবি